Tag Archives: বাংলা গল্প

উপেক্ষিত বন্ধু

Upekkhito bondhu

বেসরকারি চাকুরীজীবি আরমান ঈদের ছুটিতে পরিবারসহ বাড়ি ফেরে। এসেই ফোন করে বন্ধু রবিনকে “কী রে দোস্ত, কোথায় আছিস?” রবিন বলে- এই তো আছি, কী বলবি বল। বন্ধুর রিপ্লাই দেয়ার স্টাইলে মন খারাপ হয়ে যায় আরমানের, এতোদিন পর বাড়িতে আসা দুজনের, দেখা করবে, একসাথে অনেক মজা করবে অথচ… 😦
ছোটো বেলা থেকে একসাথে বেড়ে ওঠা আরমান সকল কাজে গুরুত্ব দেয় বন্ধু রবিনকে, এমনকি নিজের পরিবারের চেয়ে বেশি। ছোটোবেলায় একবার বন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার মায়ের অসুস্থতায় একাই দৌড়াদৌড়ি করেছিলো আরমান। ওষুধ কেনা থেকে শুরু করে নিজের সব কাজ ফেলে আন্তরিক সেবা-শুশ্রুষার মাধ্যমে বন্ধুর মাকে সুস্থ করে তোলে সে। এমন একটা ঘটনার পরেও সামান্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেনি রবিন। তবুও তাতে দুঃখ নেই আরমানের। যে কোনো উপলক্ষে প্রথম SMS টা রবিনকেই দেয় সে। নিজের যে কোনো অর্জন বা ভালো লাগার যে কোনো বিষয় সবার আগে তাকেই জানায়। যে কোনো বিজনেস প্ল্যান বা বেড়ানোর চিন্তা মাথায় এলে বন্ধু রবিনকে না জানালে যেনো শান্তি হয় না তার। যে কোনো মজার ঘটনা বা মন খারাপের কথা বন্ধুকে সবার আগে জানানো চায়। কিন্তু রবিনের সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, তার জগতে অন্য কিছু খেলা করে। অন্য বন্ধু বান্ধব আর পরিবারই যেনো তার সবকিছু, যদিও রবিনের যে কোনো দুঃসময়ে সবার আগে পাশে এসে দাঁড়ায় আরমান। রবিন তাকে গুরুত্ব দিক বা না দিক, আরমান তবুও সারাক্ষণ রবিনকে নিয়েই ব্যস্ত। একবার আরমানের ৫,০০০ টাকা প্রয়োজন ছিলো, কিছু না ভেবে বন্ধু রবিনের কাছেই চেয়ে বসে। টাকা দেয়ও সে। কিন্তু দুদিন না যেতেই টাকাটা ফেরত চায় রবিন। ফেরত দিতে না পারায় দুটো কথাও শোনায় সে। অথচ কদিন আগেই রবিনের স্ত্রীর সন্তান প্রসবের সময় হাসপাতালের খরচে অফেরতযোগ্য অংশীদার হয়েছিলো আরমান। দিনের পর দিন বন্ধুর কাছে বারবার উপেক্ষিত হয়েও ছ্যাচড়ার মতো বন্ধুর জন্য মন কাঁদতো তার সবসময়। এ নিয়ে আমি নিজেও কতোবার ওকে কথা শুনিয়েছি- “যে তোর জন্য সামান্যতম চিন্তাটুকুও করে না, তার জন্য এতো পরান পোড়ে ক্যান রে তোর?” আরমানের জন্য রবিনের উপেক্ষা ছিলো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার, এটা আমরা সবসময়ই লক্ষ্য করতাম। মানুষের আচার-ব্যবহার, কথাবার্তা যে তার অন্তঃস্থ অবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে; মুখে না বললেও বুঝিয়ে দেয় অনেক কিছু। যায় হোক, আরমান রবিনকে ফোন করলেই উপেক্ষার ঢঙে উত্তর “কী বলবি বল” আর ব্যাক্তিগত যে কোনো বিষয়ে খোঁজখবর নিতে গেলেই উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে চলাটাকে আরমানের হৃদয়ে ক্ষত তৈরি করতে থাকে। এভাবে অনেক দিন পেরিয়ে যায়।
একদিন হঠাৎ রবিনের এক বন্ধু মারফত আরমান জানতে পারে যে, রবিন হাসপাতালে অ্যাডমিটেড। খবর নিয়ে সে জানতে পারে বন্ধুর অবস্থা আশংকাজনক, দুটি কিডনিই অকার্যকর হয়ে গেছে তার, চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় যাকে কিডনি ফেলিউর বলা হয়ে থাকে। ইমিডিয়েট কিডনি প্রতিস্থাপন করতে হবে। অথচ আরমানের ফ্লাইটের বাকী দুদিন। কাউকে কিছু না জানিয়ে ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে নিজের একটি কিডনি দান করে বন্ধুর জীবন বাঁচাতে। এর দুদিন পর মেয়ে শ্রাবন্তী কে কোলে নিয়ে মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিতে যায় আরমান। মেয়ে শ্রাবন্তীকে দাদীর কোলে রেখে এসে সবার অগোচরে ভালোবাসার আলিঙ্গনে অশ্রুসিক্ত বিদায় নেয় স্ত্রীর কাছ থেকে। এরপর ঢাকা বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া আরমানকে বহনকারী মালয়েশিয়াগামী ঐ বিমানটি পথিমধ্যে নিখোঁজ হলে বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে। কিছু সময় পূর্বে বিদায় দেয়া সন্তানের দূর্ঘটনায় মায়ের গগনবিদারী আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, জ্ঞান হারান মা। প্রাণপ্রিয় স্বামীর এ খবরে মুহুর্তেই পৃথিবীর সমস্ত অন্ধকার এসে ভর করে স্ত্রী শশীর উপরে। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আরমানের প্রিয়তমা স্ত্রী শশী। মেয়ে শ্রাবন্তী কিছু বুঝে উঠার আগেই দাদী আর মায়ের এই অবস্থা দেখে চিৎকার করে কান্না করতে থাকে। ওদিকে রবিনও হাসপাতাল থেকে আরমানের এই অবস্থার কথা জানতে পেরে ব্যথিত হয়, কিন্তু তখনও সে জানে না কার জন্য সে এখনও পৃথিবীর আলো দেখতে পারছে। পরে রবিন যখন জানতে পারে, তার শরীরের মধ্যে আরমানের কিডনি প্রতি মুহুর্তে তার রক্ত পরিশোধন করে তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে, তখন পৃথিবীর সমস্ত অনুশোচনা যেনো এসে ভর করে তার উপরে। পেছনের সব উপেক্ষার কথা মনে পড়ে যায় তার, বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে। সে বুঝতে পারে- যেসব বন্ধুদের সে এতাদিন গুরুত্ব দিয়ে এসেছে, আজ বিপদের দিনে কেউই পাশে নেই তার, অথচ জীবনভর যাকে উপেক্ষা আর অবহেলা করে গেছে, তার দেয়া কিডনির কারণেই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে তার শরীরে, আজও সে উপভোগ করছে সুন্দর এ পৃথিবীর আলো-বাতাস। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। না ফেরার দেশে চলে গেছে রবিন কর্তৃক সারাজীবন উপেক্ষিত বন্ধু আরমান। টপ করে দু ফোটা জ্বল গড়িয়ে পড়ে পত্রিকার পাতার উপর। বন্ধু রবিনের চোখের জ্বলে সিক্ত হয় পত্রিকার পাতায় বন্ধু আরমানের না ফেরার খবরটি।

লেখকঃ আজিজুর রহমান দুলাল

Advertisements

সেই ঈদ এই ঈদ

eid

বাবা-মায়ের সবচেয়ে ছোট সন্তান সৌরভ একদা গ্যাদা নামেই অভিহিত ছিলো, দাদু শখ করে গেদু ডাকতো। বড় হওয়ার পর থেকে সৌরভ কখনোই রোজা বাদ দিতো না, নামাজও পড়তো ৫ ওয়াক্ত। সেবার দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। রাতের বেলা বৃষ্টিতে টিনের চালের মধুর শব্দে আর প্রকৃতির মিষ্টি-শীতল হাওয়ায় ফজরের নামাজের জন্য ওকে বেশ কয়েকবার ডাকা হলেও মায়ের ডাকে এবার আর ঘুম ভাঙেনি সৌরভের। তবে আগেরদিন চাঁদরাত উপলক্ষে পিকনকেরই বা দোষ কম কীসে! স্বভাবসূলভ ১০ টার পরিবর্তে পিকনিকের জন্যই তো সে রাতে ওকে বিছানায় যেতে হয়েছিলো রাত ১২ টায়।
সকালে বাড়ির উঠোনে ঘর থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া হাঁসের প্যাক প্যাক শব্দে ঘুম ভাঙতেই উঠে যখন দেখে সকাল ৭ টা বাজে, তখন ঈদের ভোরে ফজরে উঠতে না পারার জন্য নিজের চুল ছিড়তে থাকে আর মায়ের কাছে গিয়ে রাগ দেখাতে থাকে- “ভোরে কেনো ডাকোনি আমাকে? ” যাই হোক, বিছানার চাদরের নিচে মা সৌরভের জন্য ৫ টাকার কচকচে নতুন নোট রেখে দিয়েছিলো। চাচা-চাচী আর বড় ভাইদের নিকট থেকে ২ টাকার নতুন নতুন নোট পেয়ে বেশ খুশি খুশি লাগছিলো সৌরভের। ঈদের নামাজের এখনো ঘন্টাখানেক বাকী, কিন্তু সৌরভ তখনো জানতো না যে তার জন্য কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে, বড় ভাই সাজিদ ওর জন্য বাজারের সবচেয়ে লেটেস্ট প্যান্ট আর জামা কিনে লুকিয়ে রেখেছিলো। গোসল শেষ করে এসে ও যখন আগে থেকে ঠিক করে রাখা জামা-কাপড় পরতে যাচ্ছে যেটা পরে ঈদগাহে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভাইয়া সারপ্রাইজ বলে চিৎকার করে উঠলো। সৌরভ বললো- কীসের সারপ্রাইজ ভাইয়া? প্যাকেট খুলতেই চোখে পানি চলে এলো সৌরভের। কারণ ওর মনটা বেশ খারাপ ছিলো এজন্য যে- ঈদে এবার ওকে নতুন জামা-কাপড় দেয়নি কেউ। নতুন জামা-প্যান্ট পেয়ে ওর খুশি আর দেখে কে? এক ঝটকায় নতুন জামা-কাপড় পরেই দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে মুখ দিয়ে ভুম ভ্রুম শব্দ করতে করতে দে ছুট! মা ডেকে বলে ” শুনে যা সৌরভ, সেমাই খেয়ে যা…, কার কথা কে শোনে, ভ্রুম ভ্রুম করতে করতে মুখে ফেনে তুলে একটু ক্ষুধা পেলে এবার বাড়িতে ফিরলো সে। চাচা-চাচী আর ভাইদের নিকট থেকে ২ টাকার কচকচে নোটে মোট ১২ টাকা পেয়ে ভাবতে থাকলো এমন ঈদ কেনো প্রতিদিন আসে না? সেমাই খাওয়া শেষে ঘর থেকে যেই না বেরোতে উদ্যত হয়েছে, মা বিছানার তলা থেকে বের করে ৫ টাকার নোটটি সামনে ধরতেই
মাকে জড়িয়ে ধরে কিছু বলার ভাষা পেলো না সৌরভ, পেছনের সব আনন্দকে যেনো ম্লান করে দিয়েছে মায়ের দেয়া ঐ ৫ টাকার নোটটি। এক গাল হাসি দিয়ে টাকাটা পকেটে পুরতে পুরতে তার ছক কষা শেষ যে ঈদগাহে গিয়ে কী কী কিনবে।

ঈদের নামাজ শেষে পেয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, চমচম, দানাদার মিষ্টি, রঙিন বেলুন আর কতো কী-ই না কিনলো সে। এবার চাচা ও বন্ধুদের বাড়ি বেড়ানোর পালা। পালা করে সবার বাড়িতে সেমাই-মিষ্টি ইত্যাদি উপাদেয় খাবার খেয়ে বাড়িতে এসে একটুও বিশ্রাম নেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না সে। ঘুরাঘুরির পর্ব যে এখনো বাকী তার। এবার ২-১ জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে নদীর ধার, বটতলা, আর সূর্যের সাথে ভাব জমিয়ে রোদে রোদে ঘুরতে থাকা। এরপর বিকেল বেলায় মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা। সেখানে একগাদা খালাতো ভাই-বোন, মামাতো ভাই-বোন, মামা-মামী, নানী সবার সাথে ঈদ যেনো এক স্বর্গীয় উৎসবে পরিণত হলো।

গল্পটা এভাবেই চলতে পারতো, কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়িতে মা চলে গেলো তার বাপের বাড়ি, বাবা সৌরভকে যেতে দিলেন না, এরপর বড় ভাই সাজিদ অবশ্য নানা বাড়িতেই মানুষ হয়েছিলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঘরে নতুন মা এলো সৌরভের। খুব অল্প বয়সে বিয়ে করায় ২৫ না পেরোনো মাকেও বিয়ে দিলো নানা বাড়ি থেকে। প্রথম কিছুদিন ভালো কাটলেও নতুন মায়ের গর্ভে সন্তান এলে কপাল পোড়া আরম্ভ হলো সৌরভের। অনেকটা দিন পেরিয়ে গেলো এভাবে………

ঢাকা শহরে এসে অন্যের রিকশা চালায় আজ সৌরভ। কদিন আগের গ্যাদা আজ রীতিমতো রিকশাচালক। ইতোমধ্যে বিয়েও করেছে সে, ঘরে তার ২ বছরের ফুটফুটে মেয়ে, নাম সুরভী। আজ আবার সেই ঈদ, মেয়ের জন্য ফুটপাত থেকে জুতসই জামা-কাপড়-জুতা পছন্দ না হওয়ায় গতকাল সন্ধ্যায় একটা শপিং মলে ঢুকে দাম জিজ্ঞাসা করতেই পকেটে যেনো টান পড়ে। বউয়ের জন্য নতুন শাড়ি, মেয়ের নতুন জামা আর নিজের জন্য নতুন একটা পাঞ্জাবী কেনার ইচ্ছা নিয়ে মার্কেটে গিয়েছিলো সে। ভাগ্যের পরিহাসে আজ সে রিকশাচালক হলেও ভেতরের গ্যাদা তো মরেনি আজও। বড় ভাইয়ের দেয়া নতুন জামায় চোখ অশ্রুসিক্ত হওয়া গ্যাদা আজো খুঁজে ফেরে তার দূরন্ত শৈশব। মেয়ের জন্য নতুন জামা কিনতেই পকেট খালি হয়ে আসে তার। নিজের জন্য না হলেও বউয়ের জন্য নতুন শাড়ি না নিলে যে ঈদটাই মাটি হয়ে যায়।
শপিং মলের হাজারো মানুষের ভীড়ে একটা নতুন শাড়ি হুট করেই ব্যাগে ভরার চেষ্টা করে সে। কিন্তু লুঙ্গি পরে শপিং করতে আসায় আগে থেকেই নজরে রেখেছিলো দোকানীরা, সাথে সাথে মেঝেতে শুইয়ে চোর চোর বলতে বলতে পিটানি শুরু করে সবাই মিলে। দুদিন পর নিজেকে সে আবিষ্কার করে হাসপাতালের বারান্দায়। চোখ খুলতেই ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে সে, সেদিনের কথা মনে করে দুচোখের কোণা দিয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ে তার। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে দূরন্ত শৈশবের স্বর্গীয় ঈদ উদযাপনের কথা।
সুরভী আর তার মায়ের ঈদের খবর আর জানা হয়নি আমাদের।

এভাবেই গ্যাদারা তাদের স্বপ্নগুলো চোখের সামনে ধুলিস্যাৎ হতে দেখে দিনের পর দিন, সৌরভদের সৌরভ আর ছড়ায়না কখনোই; সুরভীরাও এভাবেই বিনষ্ট হয় অঙ্কুরেই। এভাবেই সৌরভদের ঈদ হয়ে যায় ধুলোমলিন আর রুপান্তরিত হয় যাতনার উপলক্ষে।
চূড়ান্ত পার্থক্য তৈরি হয় সেই ঈদ আর এই ঈদের।

 

লেখকঃ আজিজুর রহমান দুলাল

Also Published: http://www.somewhereinblog.net/blog/mardulal/30201186