সেই ঈদ এই ঈদ

eid

বাবা-মায়ের সবচেয়ে ছোট সন্তান সৌরভ একদা গ্যাদা নামেই অভিহিত ছিলো, দাদু শখ করে গেদু ডাকতো। বড় হওয়ার পর থেকে সৌরভ কখনোই রোজা বাদ দিতো না, নামাজও পড়তো ৫ ওয়াক্ত। সেবার দেশে প্রচুর বৃষ্টি হয়েছিলো। রাতের বেলা বৃষ্টিতে টিনের চালের মধুর শব্দে আর প্রকৃতির মিষ্টি-শীতল হাওয়ায় ফজরের নামাজের জন্য ওকে বেশ কয়েকবার ডাকা হলেও মায়ের ডাকে এবার আর ঘুম ভাঙেনি সৌরভের। তবে আগেরদিন চাঁদরাত উপলক্ষে পিকনকেরই বা দোষ কম কীসে! স্বভাবসূলভ ১০ টার পরিবর্তে পিকনিকের জন্যই তো সে রাতে ওকে বিছানায় যেতে হয়েছিলো রাত ১২ টায়।
সকালে বাড়ির উঠোনে ঘর থেকে সদ্য ছাড়া পাওয়া হাঁসের প্যাক প্যাক শব্দে ঘুম ভাঙতেই উঠে যখন দেখে সকাল ৭ টা বাজে, তখন ঈদের ভোরে ফজরে উঠতে না পারার জন্য নিজের চুল ছিড়তে থাকে আর মায়ের কাছে গিয়ে রাগ দেখাতে থাকে- “ভোরে কেনো ডাকোনি আমাকে? ” যাই হোক, বিছানার চাদরের নিচে মা সৌরভের জন্য ৫ টাকার কচকচে নতুন নোট রেখে দিয়েছিলো। চাচা-চাচী আর বড় ভাইদের নিকট থেকে ২ টাকার নতুন নতুন নোট পেয়ে বেশ খুশি খুশি লাগছিলো সৌরভের। ঈদের নামাজের এখনো ঘন্টাখানেক বাকী, কিন্তু সৌরভ তখনো জানতো না যে তার জন্য কী সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে, বড় ভাই সাজিদ ওর জন্য বাজারের সবচেয়ে লেটেস্ট প্যান্ট আর জামা কিনে লুকিয়ে রেখেছিলো। গোসল শেষ করে এসে ও যখন আগে থেকে ঠিক করে রাখা জামা-কাপড় পরতে যাচ্ছে যেটা পরে ঈদগাহে যাবে, ঠিক তখনই পেছন থেকে ভাইয়া সারপ্রাইজ বলে চিৎকার করে উঠলো। সৌরভ বললো- কীসের সারপ্রাইজ ভাইয়া? প্যাকেট খুলতেই চোখে পানি চলে এলো সৌরভের। কারণ ওর মনটা বেশ খারাপ ছিলো এজন্য যে- ঈদে এবার ওকে নতুন জামা-কাপড় দেয়নি কেউ। নতুন জামা-প্যান্ট পেয়ে ওর খুশি আর দেখে কে? এক ঝটকায় নতুন জামা-কাপড় পরেই দুই হাত দুদিকে প্রসারিত করে মুখ দিয়ে ভুম ভ্রুম শব্দ করতে করতে দে ছুট! মা ডেকে বলে ” শুনে যা সৌরভ, সেমাই খেয়ে যা…, কার কথা কে শোনে, ভ্রুম ভ্রুম করতে করতে মুখে ফেনে তুলে একটু ক্ষুধা পেলে এবার বাড়িতে ফিরলো সে। চাচা-চাচী আর ভাইদের নিকট থেকে ২ টাকার কচকচে নোটে মোট ১২ টাকা পেয়ে ভাবতে থাকলো এমন ঈদ কেনো প্রতিদিন আসে না? সেমাই খাওয়া শেষে ঘর থেকে যেই না বেরোতে উদ্যত হয়েছে, মা বিছানার তলা থেকে বের করে ৫ টাকার নোটটি সামনে ধরতেই
মাকে জড়িয়ে ধরে কিছু বলার ভাষা পেলো না সৌরভ, পেছনের সব আনন্দকে যেনো ম্লান করে দিয়েছে মায়ের দেয়া ঐ ৫ টাকার নোটটি। এক গাল হাসি দিয়ে টাকাটা পকেটে পুরতে পুরতে তার ছক কষা শেষ যে ঈদগাহে গিয়ে কী কী কিনবে।

ঈদের নামাজ শেষে পেয়াজু, আলুর চপ, বেগুনি, চমচম, দানাদার মিষ্টি, রঙিন বেলুন আর কতো কী-ই না কিনলো সে। এবার চাচা ও বন্ধুদের বাড়ি বেড়ানোর পালা। পালা করে সবার বাড়িতে সেমাই-মিষ্টি ইত্যাদি উপাদেয় খাবার খেয়ে বাড়িতে এসে একটুও বিশ্রাম নেয়ার প্রয়োজন মনে করলো না সে। ঘুরাঘুরির পর্ব যে এখনো বাকী তার। এবার ২-১ জন বন্ধুকে সাথে নিয়ে নদীর ধার, বটতলা, আর সূর্যের সাথে ভাব জমিয়ে রোদে রোদে ঘুরতে থাকা। এরপর বিকেল বেলায় মামা বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা। সেখানে একগাদা খালাতো ভাই-বোন, মামাতো ভাই-বোন, মামা-মামী, নানী সবার সাথে ঈদ যেনো এক স্বর্গীয় উৎসবে পরিণত হলো।

গল্পটা এভাবেই চলতে পারতো, কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যেই বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়িতে মা চলে গেলো তার বাপের বাড়ি, বাবা সৌরভকে যেতে দিলেন না, এরপর বড় ভাই সাজিদ অবশ্য নানা বাড়িতেই মানুষ হয়েছিলেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঘরে নতুন মা এলো সৌরভের। খুব অল্প বয়সে বিয়ে করায় ২৫ না পেরোনো মাকেও বিয়ে দিলো নানা বাড়ি থেকে। প্রথম কিছুদিন ভালো কাটলেও নতুন মায়ের গর্ভে সন্তান এলে কপাল পোড়া আরম্ভ হলো সৌরভের। অনেকটা দিন পেরিয়ে গেলো এভাবে………

ঢাকা শহরে এসে অন্যের রিকশা চালায় আজ সৌরভ। কদিন আগের গ্যাদা আজ রীতিমতো রিকশাচালক। ইতোমধ্যে বিয়েও করেছে সে, ঘরে তার ২ বছরের ফুটফুটে মেয়ে, নাম সুরভী। আজ আবার সেই ঈদ, মেয়ের জন্য ফুটপাত থেকে জুতসই জামা-কাপড়-জুতা পছন্দ না হওয়ায় গতকাল সন্ধ্যায় একটা শপিং মলে ঢুকে দাম জিজ্ঞাসা করতেই পকেটে যেনো টান পড়ে। বউয়ের জন্য নতুন শাড়ি, মেয়ের নতুন জামা আর নিজের জন্য নতুন একটা পাঞ্জাবী কেনার ইচ্ছা নিয়ে মার্কেটে গিয়েছিলো সে। ভাগ্যের পরিহাসে আজ সে রিকশাচালক হলেও ভেতরের গ্যাদা তো মরেনি আজও। বড় ভাইয়ের দেয়া নতুন জামায় চোখ অশ্রুসিক্ত হওয়া গ্যাদা আজো খুঁজে ফেরে তার দূরন্ত শৈশব। মেয়ের জন্য নতুন জামা কিনতেই পকেট খালি হয়ে আসে তার। নিজের জন্য না হলেও বউয়ের জন্য নতুন শাড়ি না নিলে যে ঈদটাই মাটি হয়ে যায়।
শপিং মলের হাজারো মানুষের ভীড়ে একটা নতুন শাড়ি হুট করেই ব্যাগে ভরার চেষ্টা করে সে। কিন্তু লুঙ্গি পরে শপিং করতে আসায় আগে থেকেই নজরে রেখেছিলো দোকানীরা, সাথে সাথে মেঝেতে শুইয়ে চোর চোর বলতে বলতে পিটানি শুরু করে সবাই মিলে। দুদিন পর নিজেকে সে আবিষ্কার করে হাসপাতালের বারান্দায়। চোখ খুলতেই ব্যাথায় ককিয়ে ওঠে সে, সেদিনের কথা মনে করে দুচোখের কোণা দিয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়ে তার। হঠাৎ করেই তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে দূরন্ত শৈশবের স্বর্গীয় ঈদ উদযাপনের কথা।
সুরভী আর তার মায়ের ঈদের খবর আর জানা হয়নি আমাদের।

এভাবেই গ্যাদারা তাদের স্বপ্নগুলো চোখের সামনে ধুলিস্যাৎ হতে দেখে দিনের পর দিন, সৌরভদের সৌরভ আর ছড়ায়না কখনোই; সুরভীরাও এভাবেই বিনষ্ট হয় অঙ্কুরেই। এভাবেই সৌরভদের ঈদ হয়ে যায় ধুলোমলিন আর রুপান্তরিত হয় যাতনার উপলক্ষে।
চূড়ান্ত পার্থক্য তৈরি হয় সেই ঈদ আর এই ঈদের।

 

লেখকঃ আজিজুর রহমান দুলাল

Also Published: http://www.somewhereinblog.net/blog/mardulal/30201186

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s